reporterলুৎফর রহমান
  ৩ সপ্তাহ আগে
Shares
facebook sharing button
twitter sharing button
pinterest sharing button
sharethis sharing button

কীর্তিনাশা,পদ্মা গঙ্গা ভাগীরথী-হুগলি নদী, একই অংগে বহুরূপ

গঙ্গা বলেন, পদ্মা বলেন, হুগলি বলেন আর ভাগীরথী বলেন, অথবা যে নামেই অভিহিত করুন, এই নদীর সংগে পরিচয় ঘটে আমাদের কৈশোরে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর শ্রীকান্ত পড়তে যেয়ে এই নদীর সংগে মিশে যায়নি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবেনা। ইন্দ্র এবং শ্রীকান্ত অন্ধকার রাতে যেভাবে হুগলি নদীতে অবগাহন করেছে তা আমাদের মগজে আজও গেঁথে আছে। 
নদীতে ভেসে যাওয়া লাশ দেখে ইন্দ্র বলেছিল, লাশের আবার জাত কি ? তেমনি প্রবাহমান এই নদী কীর্তিনাশা,পদ্মা গঙ্গা ভাগীরথী-হুগলি যে নামেই প্রবাহিত হোকনা কেন এটি জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনে। ভারত-বাংলাদেশের মাঝে এক রাজনৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে এই নদী বয়ে চলেছে। এই নদীর বুকেই ফারাক্কা বাঁধ ঐতিহাসিক এক প্রশ্ন খাড়া করে রেখেছে। এই নদীর কোথাও টৈটম্বুরতা আবার কোথাও শীর্ণকায়া রূপ। 

হুগলি নদী বা ভাগীরথী-হুগলি পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা নদীর একটি শাখানদী। পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬০ কিলোমিটার। মুর্শিদাবাদ জেলার পূর্ব প্রান্তে গিড়িয়া শহরের নিকটবর্তী স্থানে গঙ্গা নদীর শাখানদী পদ্মার ধারে ভাগীরথীর আদি উৎসমুখ থেকে এই নদীটি উৎসারিত হয়েছে। সেখান থেকে কম জল প্রবাহ নিয়ে পশ্চিমে বয়ে চলে ভাগীরথী। 
মুর্শিদাবাদের আরো পশ্চিম থেকে ১৯৬২-১৯৭০ সালের মধ্যে নির্মিত গঙ্গার উপরে অবস্থিত ফারাক্কা বাঁধ থেকে একটি খাল, যার নাম হল ফারাক্কা ফিডার ক্যানাল, বেশ অনেকটা জল নিয়ে এনে ফেলে ভাগীরথীতে।

পৌরাণিক সূত্রে জানা যায় যে মধ্যযুগ পর্যন্ত ভাগীরথীর আদি উৎসমুখ গঙ্গার থেকে বেরিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে বয়ে চলে। 
বর্তমানে ফারাক্কা ক্যান্যালের জল বহন করে ভাগীরথী বয়ে চলেছে দক্ষিণের দিকে। অনেক বড় শহর এই নদীর তীরে অবস্থিত। যেমন দূর্গাপুর, কল্যাণী, ত্রিবেণী, ব্যান্ডেল, ইত্যাদি। হুগলি জেলার হুগলি-চুঁচুড়া শহরটি (পূর্বনাম হুগলি) এই নদীর তীরে অবস্থিত। হুগলি নামটির উৎস অজ্ঞাত, তাই জানা যায় না যে নদী না শহর কোনটির নামকরণ আগে হয়েছিল।
ভাগীরথী নামটি পৌরাণিক। কিংবদন্তি অনুযায়ী, সগর রাজার বংশধর তথা সগরবংশীয় রাজা দিলীপের পুত্র রাজা ভগীরথ মর্ত্যলোকে গঙ্গা নদীর পথপ্রদর্শক ছিলেন বলে গঙ্গার অপর নাম ভাগীরথী। হুগলি নামটি অপেক্ষাকৃত প্রাচীন ।

ইংরেজ আমলেই সর্বপ্রথম ভাগীরথীর দক্ষিণভাগের প্রবাহকে হুগলি নামে অভিহিত হয়।
ভাগীরথী-হুগলি গঙ্গার মূল প্রবাহপথ নয়। গঙ্গা নদীর মূল প্রবাহটি পদ্মা নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত। লোকবিশ্বাসে ভাগীরথী-হুগলিও গঙ্গার মূল ধারা এবং সেই অর্থে পবিত্র ও পূজ্য। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা এই নদীর তীরেই অবস্থিত।
বাংলার প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে ও লেখমালায় সর্বত্রই ভাগীরথীকে গঙ্গা বলা হয়েছে। ধোয়ীর পবনদূত গ্রন্থে ত্রিবেণী-সঙ্গমের ভাগীরথীকেই বলা হয়েছে গঙ্গা। লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর পট্টোলীতে বেতড়ে পূর্ববাহি নদীটি জাহ্নবী নামে অভিহিত। বল্লালসেনের নৈহাটি লিপিতে ভাগীরথীকে ‘সুরসরিৎ’ অর্থাৎ স্বর্গীয় নদী আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যেও ভাগীরথীর উদার প্রশস্তি করা হয়েছে। পদ্মাপুরাণ, কবিকঙ্কণ চণ্ডী এমনকি মুসলমান কবিদের রচনাতেও গঙ্গার স্তুতি দেখা যায়। ১৪৯৪ সালে রচিত বিপ্রদাস পিপলাই-এর মনসামঙ্গল কাব্যে অজয় নদ থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত ভাগীরথী-হুগলির প্রবাহপথের এক মনোজ্ঞ বর্ণনা পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ১৬৬০ সালে দেওয়া ফান ডেন ব্রোকের তথ্যের বেশ মিল লক্ষিত হয়।
গঙ্গা নদীর ২৫৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পথের ৫২৪ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত। রাজমহল পাহাড়ের উত্তর-পশ্চিমে তেলিগড় ও সকরিগলির সংকীর্ণ গিরিপথটি ঘেঁষে মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমায় গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। এরপর ধুলিয়ান শহরের নিকটে এটি ভাগীরথী ও পদ্মা নামে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। 

ভাগীরথীর প্রবাহ মুর্শিদাবাদ জেলাকে দুটি ভৌগোলিক অংশে বিভক্ত করেছে – বাগড়ি (পূর্বভাগে) ও রাঢ় (পশ্চিমভাগে)। এরপর নবদ্বীপ পর্যন্ত গঙ্গার নাম ভাগীরথী ও নবদ্বীপ থেকে গঙ্গাসাগর অবধি এই নদী হুগলি নামে প্রবাহিত। নবদ্বীপের আরও দক্ষিণে হুগলি জেলা এবং উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা। এই নদী হালিশহর, চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর, কামারহাটী শহরগুলির পাশদিয়ে প্রবাহিত হয়। তারপর কলকাতা (কলকাতা) এবং হাওড়া এর দ্বৈত শহর প্রবেশ করার আগে, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমে নদীটি নূরপুরে গঙ্গার একটি পুরানো প্রবাহে প্রবেশ করে এবং নদীটি সাগরদ্বীপের দক্ষিণ পান্তে গঙ্গাসাগরের মোহনায় প্রায় ২০ মাইল (৩২ কিলোমিটার) চওড়া হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়।

এই নদীর দুটি প্রধান উপনদী হল দামোদর ও রূপনারায়ণ। কলকাতা শহর ও মহানগর হুগলির তীরেই অবস্থিত। হুগলি নদীর গড় গভীরতা ২০০ ফুট এবং সর্বচ্চো গভীরতা ৩৮১ ফুট।
ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য একটি অপরিহার্য লাইফলাইন হিসাবে কাজ করে। এই নদীর জলপথ দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় যাত্রা করেছিল এবং তাদের বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং কলকাতা শহরকে ব্রিটিশ ভারত রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফ্রান্স, ডাচ, পর্তুগিজ প্রভৃতি অন্যান্য দেশের লোকেরা এই নদীর তীরে তাদের বাণিজ্য বসতি স্থাপন করেছিল।
কলকাতা-হাওড়া শহর সংযোগ কারি হাওড়া সেতু, বিদ্যাসাগর সেতু, বিবেকানন্দ সেতু, নিবেদিতা সেতু (দ্বিতীয় বিবেকানন্দ সেতু), জুবিলী ব্রিজ (চুঁচুড়িয়া) এবং ঈশ্বরগুপ্ত সেতুসহ হুগলি নদীতে বেশ কয়েকটি সেতু রয়েছে।

বাংলাদেশ অংশঃ পদ্মা বাংলাদেশের প্রধান নদী। এটি হিমালয়ে উৎপন্ন গঙ্গানদীর প্রধান শাখা এবং বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজশাহী এই পদ্মার উত্তর তীরে অবস্থিত। বাংলাদেশে নদীটির দৈর্ঘ্য ৩৪১ কিলোমিটার (নদী রক্ষা কমিশন রিপোর্ট ২০২৩) ,গড় প্রস্থ ১০ কিলোমিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা "পাউবো" কর্তৃক পদ্মা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ৩২।[ রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা। পদ্মা বা গঙ্গার শুরুতেই এর মধ্যে ছয়টি দীর্ঘতম ধারা এবং গঙ্গার সঙ্গে তাদের সঙ্গমস্থলগুলোকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে। এই ছয়টি ধারা হল অলকানন্দা, ধৌলীগঙ্গা, নন্দাকিনী, পিণ্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী। পঞ্চপ্রয়াগ নামে পরিচিত পাঁচটি সঙ্গমস্থলই অলকানন্দার উপর অবস্থিত। এগুলি হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (যেখানে ধৌলীগঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে), নন্দপ্রয়াগ (যেখানে নন্দাকিনী মিশেছে), কর্ণপ্রয়াগ (যেখানে পিণ্ডার মিশেছে), রুদ্রপ্রয়াগ (যেখানে মন্দাকিনী মিশেছে) এবং সবশেষে দেবপ্রয়াগ যেখানে ভাগীরথী ও অলকানন্দার মিলনের ফলে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে।
কীর্তিনাশা,পদ্মা গঙ্গা ভাগীরথী-হুগলি যাই বলিনা কেন এই নদী শুধু অর্থনীতিকেই সম্মৃদ্ধ করেনি। এই নদী সাহিত্য সংস্কৃতিতে বিশাল এক প্রভাব বিস্তার করেছে। এই নদী মিশে আছে আমাদের হৃদয়ে। এই নদী যেন এক রমণী। একই অংগে বহুরূপতা নিয়ে এই নদী কথা বলে রমণীর মত। 

  • সর্বশেষ