রমজান আসার আগে আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নিন

মোমিনের জীবনে রমজান হলো এক আধ্যাত্মিক বসন্ত। তবে এই বসন্তের ফসল ঘরে তুলতে হলে প্রস্তুতি শুরু করতে হয় আগেভাগেই। প্রখ্যাত তাবেয়ি আবু বকর আল-ওয়াররাক বলতেন, ‘রজব মাস বীজ বোনার মাস, শাবান মাস ফসলে পানি দেওয়ার মাস আর রমজান হলো ফসল কাটার মাস।’ তাই রমজানের পরিপূর্ণ বরকত পেতে শাবান মাস থেকেই আমাদের কোমর বেঁধে নামতে হবে। পাঠকদের জন্য রমজানের প্রস্তুতির ১৫টি বিশেষ দিক তুলে ধরা হলো-
তওবা ও সংকল্পের শুদ্ধতা : ঘর সাজানোর আগে যেমন পরিষ্কার করতে হয়, তেমনি রমজানের ইবাদতে মন বসাতে হলে আগে অন্তরকে গোনাহমুক্ত করতে হবে। গত ১১ মাসের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চেয়ে নতুন জীবনের সংকল্প করতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মোমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা নূর : ৩১)।
শাবানের রোজা ও নববি আদর্শ : রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার জন্য শরীর ও মনকে প্রস্তুত করতে শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা জরুরি। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি’ (বোখারি : ১৯৬৯)। তবে যাদের শারীরিক দুর্বলতা আছে, তারা শাবানের শেষার্ধে রোজা না রেখে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন।
কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস : শাবান মাসকে বলা হয় ‘শাহরুল কুররা’ বা কারিদের মাস। রমজানে বুঝে বুঝে এক খতম এবং দেখে পড়ে একাধিক খতম করতে চাইলে বেশি পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত এখন থেকেই করতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম শাবান মাস শুরু হলে ব্যবসার কাজ গুটিয়ে কুরআনের দিকে নিবিষ্ট হতেন। প্রতিদিন অন্তত এক বা দুই পারা তেলাওয়াতের অভ্যাস এখন থেকেই শুরু করা উচিত।
বকেয়া রোজা পূর্ণ করা : যদি গত রমজানের কোনো কাজা রোজা বাকি থাকে, তবে এই শাবান মাসেই তা পূরণ করে নেওয়া একান্ত আবশ্যক। আম্মাজান আয়েশা (রা.) তাঁর বকেয়া রোজাগুলো শাবান মাসেই আদায় করতেন। অবহেলা করে রমজান আসার আগে কাজা রোজা আদায় না করা শরিয়তসম্মত নয়।
হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত অন্তর : রমজানের রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অন্তরের কলুষতা। শাবানের মধ্যরজনীতে আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করলেও মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করেন না। তাই ভাইয়ে ভাইয়ে বা আত্মীয়দের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য থাকলে তা মিটিয়ে ফেলে অন্তরকে ‘মাখমুম’ বা স্বচ্ছ করে তুলতে হবে।
কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের প্রস্তুতি : রমজানে আমরা তারাবি ও শেষ রাতে সাহরি খেতে উঠি। এই অভ্যাসটি শাবান থেকেই শুরু করা উচিত। অন্তত দুই রাকাত করে হলেও শেষ রাতে নফল নামাজ পড়ার অভ্যাস করলে রমজানে দীর্ঘ ইবাদত আর কষ্টকর মনে হবে না।
অপ্রয়োজনীয় আসক্তি বর্জন : সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল গেম বা অনর্থক আড্ডার পেছনে আমরা প্রচুর সময় নষ্ট করি। ইমাম মালেক (রহ.) রমজান এলে ইলমি মজলিস ছেড়ে দিয়ে কোরআনে মশগুল হতেন। আমরাও যদি এখন থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে না আনি, তবে রমজানের মূল্যবান মুহূর্তগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই হারিয়ে যাবে।
আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করা : রমজান আসার আগে আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নিন। বিশেষ করে যারা অসচ্ছল, তাদের পাশে দাঁড়ান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বোখারি : ৫৯৮৪)। ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোই হতে পারে রমজানের শ্রেষ্ঠ প্রস্তুতি।
পরিমিত আহার ও নিদ্রার অনুশীলন : রমজানে দিনের বেলা পানাহার বর্জন করতে হয়। তাই এখন থেকেই ভূরিভোজ কমিয়ে রসনা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে শরীরকে রমজানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে ইবাদতের সময় অলসতা না আসে।
