reporterআজকের টাইমস ডেস্ক
  ৬ দিন আগে
Shares
facebook sharing button
twitter sharing button
pinterest sharing button
sharethis sharing button

হৃদয়জুড়ে মানুষের জন্য ভালোবাসা পুষতেন মুহাম্মদ (সা.)

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হৃদয় ছিল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। তিনি হৃদয়জুড়ে মানুষের জন্য ভালোবাসা পুষতেন, উদার চিত্তে ভালোবাসা বিলি করতেন। সৃষ্টিকুলের প্রতি তাঁর অপরিসীম দয়া। তাঁর দয়ার পরিধি সমস্ত সৃষ্টির ওপর সমান বিস্তৃত ছিল। তাঁর দয়াশীল আচরণ শত্রুর হৃদয়েও ঝড় তুলত। কেড়ে নিতো চোখের ঘুম।

মাদ্রাসার আবাসিক শিক্ষক, মসজিদের ইমামণ্ডমুয়াজ্জিন, প্রাইভেট কোম্পানির কর্মকর্তা, সময় নির্ধারণ না করে কাজ করে যাওয়া শ্রমিক, বাড়ির দারোয়ান ও শিক্ষালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীসহ নানারকম মানুষ বিভিন্ন রকম জীবন বয়ে বেড়ান। চাইলেই ইচ্ছেমতো বাড়ি যেতে পারেন না। সদ্য বিবাহিত মাদরাসা-স্কুলের আবাসিক শিক্ষকও প্রতি সপ্তাহে ছুটি পান না। নানাবিধ প্রয়োজনের অজুহাতে পরিচালক তাকে আটকে রাখেন।

আজান ও নামাজ পড়ানোর দোহাই দিয়ে অনেক মসজিদে ইমামণ্ডমুয়াজ্জিনদের অন্তত একমাস নাগাদ বন্দি রাখা হয় মসজিদের ছোটো কামরার ভেতর। ছুটি চাইলেই কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারির শুরু হয় টালবাহানা। অনেকে প্রাইভেট কোম্পানিতে ১০-১২ ঘণ্টা ডিউটি করেও ছয় মাসে এক সপ্তাহের ছুটি চাওয়ার জো নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে বরং মুখের ওপর বলে দেওয়া হয়, খুব জরুরি হলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চলে যান।

ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ ছুটির দিনগুলোতে সবাই বাড়ি ফিরে। শুধু বাড়ি ফেরা হয় না দারোয়ানের। আনন্দ আহ্লাদ থাকে না বাড়ির কাজের মেয়েটিরও। ঈদে মেহমানের চাপ সামলাতে হবে বলে ছুটি দেওয়া হয় না তাকে। যেতে দেওয়া হয় না বাড়ির প্রিয়জনদের কাছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মের বেড়াজালে শ্রমিককে বন্দি করে রাখেন মালিকপক্ষ। ফলে তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে ভালোবেসে দায়িত্ব পালন করে না। কাজে মনোযোগী হয় না। তখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে করা হয় হয়রানি ও হেনস্তা।

মুহাম্মাদ (সা.)-ও ছিলেন মদিনার অধিপতি। একজন শিক্ষক। তাঁর অধীনে অসংখ্য সাহাবি জীবন পরিচালনা করতেন। তাঁর কাছে ইসলাম শিখতেন। তাদের যখন বাড়ি ফেরার সময় হতো, নবী (সা.) তাদের ছুটি দিয়ে দিতেন। কাজ বুঝিয়ে দিয়ে দিতেন। হোমওয়ার্ক দিতেন। খুশি মনে বাড়ি যেতেন তারা। বাড়ি ফিরে হোমওয়ার্ক করতেন।

সাহাবি আবু সুলাইমান মালিক ইবনে হুওয়ায়রিস (রা.) বলেন, ‘আমরা প্রায় সমবয়সি কয়েকজন যুবক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলাম। বিশ দিন তাঁর কাছে থাকলাম। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা পরিবারের কাছে প্রত্যাবর্তনের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছি। তিনি আমাদের পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলে অবস্থা জানালাম। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয় ও দয়ার্দ্র। নবী (সা.) বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিজনের কাছে ফিরে যাও। তাদের (কোরআন) শিক্ষা দাও, (সৎ কাজের) আদেশ করো এবং যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ, ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করো। নামাজের সময় হলে তোমাদের একজন আজান দেবে এবং যে তোমাদের মধ্যে বড়ো সে ইমামতি করবে।’ (বোখারি : ৬০০৮)।

বর্তমানে দেখা গেছে, অনেক কোম্পানি ইমপ্লয়িদের সপ্তাহে দুই দিন বা তিন দিন অফিসে আসতে বলেন। বাকি দুই দিন রিমোট অফিস করান। সপ্তাহের বাকি দুই দিন ছুটি। অনেকে আবার সপ্তাহে দুদিন মাত্র অফিস করতে বলেন। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো ইমপ্লয়িদের কাছ থেকে ভালো ফিডব্যাক পাচ্ছে। ইমপ্লয়িরাও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছেন। কোম্পানিকে সর্বোচ্চটুকু দিচ্ছেন। এই থিউরি নবী (সা.) পনেরো শত বছর আগেই উপস্থাপন করে গেছেন। তিনি শিক্ষার্থী, যোদ্ধা কিংবা অন্যান্য দায়িত্বশীলদের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিয়ে কাজ আদায় করেছেন। খবরদারি বা দারোগাগিরি করে নয়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবহার ছিল প্রভাতে ফোটা গোলাপের নরম কুসুমের মতো কোমল। তাঁর হৃদয় আকাশের মতো উন্মুক্ত ছিল সব মানুষের জন্য। দাস-দাসী, কৃষ্ণাঙ্গ, খর্বাকায়, কৃশকায়সহ সবাই তাঁর কাছে সমান মর্যাদা পেত। তাঁর দরাজ দিল ছিল মানুষের জন্য ভালোবাসায় পূর্ণ। আনাস (রা.) ছিলেন তাঁর একান্ত খাদেম। দশ বছর খেদমত করেছেন। আনাস (রা.) তখন কিশোর। কাজে ভুল করতেন। কোথাও পাঠালে পথে কাজের কথা ভুলে যেতেন। সমবয়সীদের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকতেন। এদিকে নবী (সা.)-এর কাজ পড়ে থাকত। তিনি তাঁকে কিছুই বলতেন না।

মুহাম্মদ (সা.) আনাস (রা.)-কে কোনো দিন কটূ কথা বলেননি। রাগ ঝাড়েননি। ধমক দেননি। কাজ থেকে অব্যাহতি দেননি; বরং আনাসের দুরন্তপনা আর ভুলে যাওয়ায় তিনি হাসতেন। খাদেমের মুখেই শোনা যাক মালিক মুহাম্মদ (সা.)-এর সহনশীলতার স্মৃতি। আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চরিত্রের দিক থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। একদিন তিনি আমাকে কোনো কাজে পাঠালেন। আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি যাব না। কিন্তু আমার অন্তরে ছিল, নবী (সা.) আমাকে যে কাজে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে যাব। আমি বাজারে যাচ্ছিলাম। পথে খেলাধুলায় মত্ত ছেলেদের পেয়ে খেলায় মজে গেলাম। পেছন দিক থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এসে আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। পেছনে ফিরে দেখি তিনি হাসছেন। বললেন, ‘হে উনাইস, আমি তোমাকে যেখানে যেতে বলেছি, সেখানে যাও।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, হ্যাঁ, আমি এক্ষুণি যাচ্ছি।’

আনাস (রা.) আরও বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি সাত বছর অথবা নয় বছর তাঁর খেদমত করেছি। কিন্তু আমার মনে পড়ছে না, তিনি আমার কোনো কাজের জন্য আমাকে বলেছেন- ‘তুমি এটা কেন করলে?’ অথবা কোনো কাজ না করলে তিনি আমার কৈফিয়ত তালাশ করেননি- ‘এ কাজ কেন করলে না।’ (আবু দাউদ : ৪৭৭৩)।

বর্তমান পৃথিবীর কতজন মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহনশীলতা ও উদারপন্থি মনোভাবের চর্চা করছে, আমরা আমাদের চারপাশে তাকালেই তা বুঝতে পারি। চারদিকে মানুষ অসহনশীলতার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অন্ধকার যুগের অত্যাচারী মানুষের মতোই আমাদের চলাফেরা। অনেক ক্ষেত্রে সে যুগকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের আচার-ব্যবহার। সে যুগে দাস-দাসী ছিল। তাদের সঙ্গে মালিকরা যাচ্ছেতাই আচরণ করত। মারধর করত নির্মমভাবে। কঠিনতম শাস্তি দিত। এখনকার কিছু মানুষও কর্মচারী বা গৃহপরিচারিকার সঙ্গে জঘন্য আচরণ করেন। টিভি-পত্রিকা ও ফেসবুকে এমন বহু খবর চোখে পড়ে, কর্মচারীকে মালিক পিটিয়েছে বা বুয়ার শরীরে গৃহকর্তী গরম তেল ঢেলে দিয়েছে কিংবা পরিচারিকাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে মালিক। কিংবা গৃহকর্মীকে করা হয়েছে যৌন নির্যাতন।

  • সর্বশেষ